ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য - হুমায়ূন আহমেদের মাতুল বংশের পূর্বপুরুষ
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের মাতুল(মায়ের) বংশের একটা শাখার পূর্বপুরুষ ছিলেন ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য। বর্তমান পুরুষরা হিন্দুয়ানির সব ছেড়েছেন, ঠাকুর পদবি ছাড়েন নি এখনও। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের এক নানার নাম আনিসুর রহমান ঠাকুর। তিনি কঠিন ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাঁর রাত কাটতো এবাদত বন্দেগি করে। হুমায়ূন আহমেদের সেই নানার মুসলমান হবার কাহিনী! :এক: ...বৃষ্টির পানিতে দিঘির পাড় পিচ্ছিল হয়ে আছে। একটা লাল প্যান্ট ছেলে দিঘির অন্যপ্রান্তে। পাড় বেয়ে পানির দিকে নামছে ছেলেটা কি একটা দুর্ঘটনা ঘটাবে? পা পিছলে পানিতে পড়ে যাবে। হরিচরণ ডাকলেন, এই, এই— উঠে আস। উঠে আস বললাম। এই ছেলে, এই! ছেলেটা তাঁকে দেখল। কিন্তু তার দৃষ্টি দিঘির সবুজ পানিতে। তার হাতে কাদামাখা পেয়ারা। সে পেয়ারা পানিতে ধুবে। তিনি উঁচু গলায় আবারো ডাকলেন, এই ছেলে— এই। তখনি ঝপ করে শব্দ হলো। কিছুক্ষণ ছেলেটির হাত পানির উপর দেখা গেল। তারপরেই সেই হাত তলিয়ে গেল। হরিচরণ পুকুরে ঝাঁপ দিলেন। হরিচরণ কীভাবে দিঘির অন্যপ্রান্তে পৌঁছলেন, কীভাবে ছেলেটাকে পানি থেকে তুললেন তা তিনি জানেন না। শুধু এইটুকু জানেন— পানি থেকে তোলার পর দেখা গেল, ছেলেটার ডানহাত অনেকখানি কেটেছে। সেখান থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। ও বাবু! বেঁচে আছিস তো! বলেই পুকুরপাড়ে জ্ঞান হারালেন। তাঁর জ্ঞান ফিরল নিজের খাটে গভীর রাতে। তাঁর চারপাশে মানুষজন ভিড় করেছে। নেত্রকোনা সদর থেকে এলএমএফ ডাক্তার সতীশ বাবু এসেছেন। তিনি বুকে স্টেথিসকোপ ধরে আছেন। পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধা মায়ালতার কান্না শোনা যাচ্ছে। বৃদ্ধা কারণে অকারণে কাঁদে। হরিচরণ বললেন, ছেলেটা কি বেঁচে আছে? মুকুন্দ বলল, বেঁচে আছে। ছেলেটার নাম কী ? জহির। জহির তাহলে বেঁচে গেছে? জে আজ্ঞে। হরিচরণ পদ্মাসন হয়ে বসলেন। মুকুন্দকে বললেন, ছেলেটাকে নিয়ে আস, আমি একটু দেখব। ঠাকুরঘরে নিয়ে আসব? কী বলেন এইসব! হ্যাঁ, ঠাকুরঘরে নিয়ে আস। সে আমার কোলে বসবে। মুসলমান ছেলে তো! হোক মুসলমান ছেলে। জহিরের মা জহিরকে কোলে নিয়ে এসেছে। সে তার সবুজ শাড়ি দিয়ে ছেলেকে ঢেকে রেখেছে। তার চোখে উদ্বেগ। বাড়িতে এত লোকজন দেখে হকচকিয়ে গেছে। হরিচরণ উঠানের জলচৌকিতে বসেছেন। তাঁর নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। শরীর ঘামছে। তিনি জহিরের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাগো! আপনার ছেলে কি ভালো আছে ? জহিরের মা জবাব না দিয়ে ছেলেকে আরো ভালো করে শাড়ি দিয়ে ঢাকল। হরিচরণ বললেন, আমার এখানে ডাক্তার আছে। ছেলেকে দেন, ডাক্তার দেখুক। আমার ছেলে ভালো আছে। হরিচরণ মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনেও মুগ্ধ হলেন। কী সুরেলা কণ্ঠ। ঈশ্বর যার প্রতি করুণা করেন সর্ব বিষয়েই করেন। মেয়েটি খালি পায়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। হরিচরণের মনে হলো, মেয়েটির পায়ের কারণেই উঠান বঝলমল করছে। এত রূপবর্তী কেউ কি এর আগে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে ? মাগো। আপনার ছেলেকে আমার কোলে দেন। আপনার ছেলে কোলে নিয়ে আমি একটা প্রার্থনা করব। পরদিন সকালেই একটি মুসলমান ছেলেকে ঠাকুরঘরে প্রবেশ করানোর অপরাধে হরিচরণকে সমাজচ্যুত এবং জাতিচ্যুত করা হলো। দুপুরের মধ্যে তাঁর ঘর জনশূন্য হয়ে গেল। মুকন্দ চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় হলো। তাকে তিনি দুটো দুধের গাই দিয়ে দিলেন। রান্নাবান্নার জন্যে যে মৈথিলি ঠাকুর ছিল, সে চুলা ভেঙে চলে গেল। নিয়ম রক্ষা করল। পতিতজনের ঘরের চুলা ভেঙে দেয়া নিয়ম। যে কোনো একটা ঘরের চালাও তুলে ফেলতে হয়। আত্মীয়স্বজনরা সেই চালা মাড়িয়ে চলে যাবে। হরিচরণের আত্মীয়স্বজন কেউ নেই বলে চালা ভাঙা হলো না।। বৃদ্ধা মায়ালতাকে সন্ধ্যার মধ্যে তিনি নৌকায় কাশি পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। মায়ালতা সঙ্গে করে কষ্টিপাথরের রাধাকৃষ্ণ মূর্তি নিয়ে বিদায়ের সময় হবিচরণ জেঠিমা'কে শেষ প্রণাম করতে গেলেন। মায়ালতা আঁৎকে উঠে বললেন, খবরদার পায়ে হাত দিবি না। তুই ডুবছস, আমারে ডুবাইস না। মায়ালতার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে হরিচরণের বিশাল বাড়ি হঠাৎ খালি হয়ে গেল। সন্ধ্যা মিলাতে না মিলাতেই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাস। হরিচরণ পাকা দালানের একপাশে বেতের ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বৃষ্টি দেখছেন। ঘর অন্ধকার। সন্ধ্যার বাতি জ্বালানো প্রয়োজন। কোথায় হারিকেন কোথায় কেরোসিন তিনি কিছুই জানেন না। বাড়ির পেছনে ছপছপ শব্দ হচ্ছে। ভূত-প্রেত কি-না কে বলবে! ভূত প্রেতরা শূন্যবাড়ির দখল নিয়ে নেয় এমন জনশ্রুতি আছে। হাসনাহেনার ঝোপের কাছে সরসর শব্দ হচ্ছে। সাপ বের হয়েছে না-কি ? শূন্যবাড়িতে ভূত প্রেতের সঙ্গে সাপও ঢোকে। বাড়ি পুরোপুরি জনশূন্য হলে আসে বাদুড়। তারা মহানন্দে বাড়ির কড়ি বর্গা ধরে মাথা ঝুলিয়ে দুলতে থাকে। যে বাড়িতে সাপ ও বাদুর সহবাস করে সেই বাড়ির মেঝে ফুঁড়ে অশ্বত্থ গাছের চারা বের হয়। বাড়িও তখন হয় পতিত। মানুষের যেমন প্রাণ আছে, বসতবাড়িরও আছে। পতিতবাড়ি হলো প্রাণশূন্য বাড়ি। :দুই: হরিচরণের জন্যে কয়েকজন মানুষের খুবই খারাপ লাগে, তার মধ্যে একজন ধনু শেখ। সে লঞ্চঘাটের টিকেট বাবু। মাঝে মাঝে টুকটাক ব্যবসা করে। কোলকাতা থেকে এক ড্রাম লাল কেরোসিন নিয়ে এসে বান্ধবপুরে বিক্রি করে। লঞ্চে পাঠিয়ে দেয় শুকনা মরিচ। এতে বাড়তি আয় যা হয় তা সে ব্যয় করে নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর পেছনে। পাউডার, স্নো, শাড়ি, রুপার গয়না। লঞ্চঘাটের কাছেই টিনের এক চালায় তার সংসার। স্ত্রীর নাম কমলা। ধনু শেখ স্ত্রীর খুবই ভক্ত। তার একমাত্র স্বপ্ন একদিন সে একটা লঞ্চ কিনবে। সেই লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সোহাগগঞ্জ চলাচল করবে। লঞ্চের নাম এমএল কমলা। এমএল হলো মোটর লঞ্চ। সেই লঞ্চে কমলা নামের যে-কোনো যাত্রী যদি উঠে সে যাবে ফ্রি। তার টিকেট লাগবে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ লঞ্চের টিকেট কাটতে এলেই ধনু-শেখ কোনো না কোনো প্রসঙ্গ তুলে হরিচরণের জাত নষ্টের কথা তুলবে। বাবু, আপনে বলেন— মনে করেন সুন্দর একটা কুত্তার বাচ্চা রাস্তায় হাঁটতেছে। আপনে 'আয় তু তু' বললেন, সে লাফ দিয়া আপনের কোলে উঠল । আপনের জাইত কিন্তু গেল না। মুসলমানের এক বাচ্চা কোলে নিছেন— জাইত গেল। এখন মীমাংসা দেন— মুসলমানের বাচ্চা কি কুত্তার চাইতে অধম ? যে সব বাবুদের এ ধরনের প্রশ্ন করা হয় তারা বিব্রত হন না। বিরক্ত হন। কেউ কেউ বলেন, তুমি টিকেট বাবু। তুমি টিকেট বেচবা। এত কথা কী ? জাইত জিনিসটা কী বুঝায়া বলেন। শরীরের কোন জায়গায় এই জিনিস থাকে, ক্যামনে যায় ? জিনিসটা কি ধুয়াশা ? তুমি বড়ই বেয়াদব। তোমার মালিকের কাছে বিচার দিব। চাকরি চইল্যা যাবে। না খায়া মরবা। মরলে মরব। তয় জাইতের মীমাংসা কইরা দিয়া মরব। তুমি জাইতের মীমাংসা করার কে? জাইতের তুমি কী বুঝ ? আমি না বুঝলেও আপনেরা তো বোঝেন। আপনেরা মীমাংসা দেন। বেয়াদবির কারণেই ধনু শেখের টিকেট বাবুর চাকরি চলে গেল। লঞ্চ কোম্পানির মালিক নিবারণ চক্রবর্তী তাকে ধর্মপাশা অফিসে ডেকে পাঠালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, ধনু, উঁইপোকা চেন? ধনু শেখ ভীত গলায় বলল, চিনি। উইপোকার পাখা কেন উঠে জানো ? উড়াল দিবার জন্যে। না। উইপোকার পাখা উঠে মরিবার তরে। তুমি উইপোকা ছাড়া কিছু না। তোমার পাখা উঠেছে। তুমি সবেরে জাইত পাইত শিখাইতেছ ? ধনু শেখ বলল, কর্তা ভুল হইছে। ভুল স্বীকার পাইলে কানে ধর। কানে ধইরা একশ' বার উঠবোস কর। ধনু দেরি করল না। কানে ধরে উঠবোস শুরু করল। সে ধরেই নিয়েছিল চাকরি চলে যাবে। কানে ধরে উঠবোসের মতো অল্প শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছে দেখে সে আনন্দ। তার হাঁটুতে ব্যথা, উঠবোস করতে কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট কোনো কষ্টই না। নিবারণ চক্রবর্তী খাতা দেখছিলেন। খাতা থেকে মাথা তুলে বললেন, একশ'বার কি হইছে? জে কর্তা হইছে। এখন বিদায় হও। তোমার চাকরি শেষ। লঞ্চঘাটায় নতুন টিকেট বাবু যাবে। আইজ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়বা নতুন টিকেট বাবু পরিবার নিয়া উঠবে। আমার চাকরি শেষ? এতক্ষণ কী বললাম ? ধনু শেখ বলল, চাকরি যদি শেষই করবেন কান ধইরা উঠবোস করাইলেন কী জন্যে ? নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, আগেই যদি বলতাম চাকরি শেষ তাহলে কি কানে ধরে উঠবোস করতা ? এই জন্যে আগে বলি নাই। ধনু শেখ বলল, এইটা আপনের ভালো বিবেচনা। তোমার ছয়দিনের বেতন পাওনা আছে। নতুন টিকেট বাবুর কাছে থাইকা নিয়া নিবা। তার নাম পরিমল। যাও, এখন বিদায়। জটিল হিসাবের মধ্যে আছি। ধনু শেখ অতি দ্রুত গভীর জলে পড়ে গেল। স্ত্রীকে নিয়ে উঠার কোনো জায়গা নেই। নিজের খরুচে স্বভাবের কারণে সঞ্চয়ও নেই। সে কিছুদিন বাজে মালের দোকান চালাবার চেষ্টা করল। স্ত্রীর জায়গা হলো নৌকায় । ছইওয়ালা নৌকার দু'পাশ শাড়ি দিয়ে ঘিরে তার ভেতরে সংসার । ধনু শেখের দোকান চলল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ তার দোকান থেকে কিছু কেনে না। আশ্চর্যের ব্যাপার, মুসলমানওরাও না। রাতে নৌকায় ঘুমাতে গিয়ে ধনু শেখ হতাশ গলায় বলে, বউ কী করি বলো তো। নতুন কোনো ব্যবসা দেখবেন? কী ব্যবসা ? ঘোড়াতে কইরা ধর্মপাশা থাইকা মাল আনবেন। এই ব্যবসা করব না বউ। যারা ঘোড়ার মাল টানাটানি করে তারার স্বভাব হয় ঘোড়ার মতো। ঘোড়া হওয়ার ইচ্ছা নাই। নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে গিয়া তার পায়ে উপুড় হইয়া পইড়া দেখবেন। পুরান চাকরি যদি ফেরত পান। ধনু শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, লাভ নাই। উনার নতুন টিকেট বাবু কাজ ভালো জানে। তার জায়গায় আমারে দিবে না। এখন উপায়? তাই ভাবতেছি। অতিদ্রুত অবস্থা এমন পর্যায়ে গেল যে চাল ডাল কেনার টাকায় টান পড়ল। এর মধ্যে আরেক বিপদ কমলা গর্ভবর্তী। তার সারাক্ষণ ভুখ লাগে। এটা সেটা খেতে ইচ্ছা করে। একদিন অর্ধেকটা মিষ্টি কুমড়া কাচা খেয়ে ফেলল । ধনু শেখ বলল, বৌ, তোমারে তোমার মায়ের কাছে পাঠায়া দেই? কমলা বলল, আপনেরে এতবড় বিপদে ফেইলা আমি বেহেশতেও যাব না। তাছাড়া আমার মা'র নিজেরই খাওন জুটে না। আমার কাছে স্বর্ণের একটা চেইন আছে। এইটা বিক্রি করেন। ধনু শেখ স্বর্ণের চেইন বিক্রি করতে পারল না। বাজারের একমাত্র স্বর্ণকারের দোকানের মালিক শ্রীধর বলল, এর মধ্যে সোনা বলতে কিছু নাই। সবই ক্ষয়া গেছে। ধনু শেখ বলল, কর্তা! না খায়া আছি। স্ত্রীর সন্তান হবে। শ্রী ধর বলল, তোমার সাথে বাণিজ্য করব না। তুমি জাত নিয়া অন্দ মন্দ কথা বলো। তোমার সাথে বাণিজ্য করলে শ্রী গণেশ বেজার হবেন। দোকান লাটে উঠব। আমিও তোমার মতো না খায়া থাকব। বন্দক রাইখা কিছু দেন। বন্দক রাখতে হয় ভগবানের নামে, তোমার আবার ভগবান কী ? ধনু শেখ বলল, তাও তো কথা। ভাদ্র মাসের একদিন ধনু শেখকে সত্যি সত্যি উপাসে যেতে হলো। সারাদিনে দুই মুঠ চিড়া ছাড়া খাওয়ার নেই। তাও ভালো কমলা খেতে পেরেছে। চাল যা ছিল তাতে একজনের মতো ভাত হয়েছে। ফ্যান ভাতে লবণ ছিটিয়ে কমলা এত আগ্রহ করে খেল যে ধনু শেখের চোখে পানি এসে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল, বউ, একটা জটিল সিদ্ধান্ত নিয়েছি? কমলা আগ্রহ নিয়ে বলল, কী সিদ্ধান্ত ? ডাকাতি করব। ডাকাতি বিনা পথ নাই। কমলা হাসতে শুরু করেই হাসি বন্ধ করে ফেলল। ধনু শেখের মুখ গম্ভীর।চোখ জ্বল জ্বল করছে। ডাকাতি করবেন ? ডাকাইতের দল থাকে, আপনের দল কই? দল লাগে না। কমলা বলল, আমার সন্তানের কসম দিয়া একটা কথা বলি। ধনু শেখ কিছু বলল না। আপনি সত্যই ডাকাতি করবেন ? এই সময় ঘাট থেকে কেউ একজন ডাকল, এটা কি ধনু শেখের নাও ? ধনু নৌকা থেকে বের হয়ে দেখে হরিচরণ পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ধনু বলল, বাবু আদাব। আদাব। তোমার সঙ্গে গল্প করার জন্যে আসছি। নায়ে উঠি? উঠেন। আমার সাথে কী গফ করবেন ? আমি একজন হলু। জুতার শুকতলি। হরিচরণ নৌকায় উঠলেন। ধনু শেখ পাটাতনে গামছা বিছিয়ে দিল। হরিচরণ বসতে বসতে বললেন, কুকুরের বাচ্চা এবং মানুষের বাচ্চা নিয়া তুমি যে এক মীমাংসা দিয়েছ, মীমাংসাটা আমার মনে লেগেছে। মীমাংসার উত্তর কি আপনের কাছে আছে ? আছে। বলেন শুনি। হরিচরণ বললেন, মানুষের তুলনা মানুষের সাথে হবে। অন্য কোনো প্রাণীর সঙ্গে হবে না। একটা মন্দ মানুষের সঙ্গে অন্য একটা মন্দ মানুষের বিবেচনা হবে। কোনো মন্দ প্রাণীর সঙ্গে হবে না। বুঝেছ? বোঝার চেষ্টা নিতেছি। হরিচরণ বললেন, আরো একটা কথা আছে। বলেন শুনি। মানুষের তুলনায় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী তুচ্ছের তুচ্ছের তুচ্ছ। ধুলিকনার চেয়েও তুচ্ছ। ধুলিকনা গায়ে তুললেও কিছু না, গা থেকে ফেলে দিলেও কিছু না। ধনু বলল, আপনি জ্ঞানী মানুষ। জ্ঞানী মানুষের জ্ঞানী কথা। আমি তুচ্ছ, তুচ্ছের কথাও তুচ্ছ। শুনেছি তুমি দুদর্শায় পড়েছ। তোমার চাকরি চলে গেছে। আমার কাছ থেকে সাহায্য নিবে ? ধনু বলল, কী সাহায্য করবেন ? কী ধরনের সাহায্য তুমি চাও ? ধনু বিরক্ত গলায় বলল, পারলে একটা লঞ্চ কিন্যা দেন। সোহাগগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ রুটে চলবে। লঞ্চের নাম এমএল কমলা। কমলা কে ? আমার পরিবারের নাম। হরিচরণ বললেন, আমি তোমাকে লঞ্চ কিনে দিব। তুমি লঞ্চ ব্যবসার সঙ্গে অনেকদিন ছিলে। এই ব্যবসা তুমি জানো। তোমার বুদ্ধি আছে। চিন্তাশক্তি আছে। তুমি পারবে। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। না বুঝে কিছু করি না। হতভম্ব ধনু শেখ বলল, সত্যি লঞ্চ কিনে দিবেন? হ্যাঁ। লা ইলাহা ইল্লালাহু। এইগুলা কী বলেন? পর্দার আড়াল থেকে কমলা মুখ বের করেছে। সে মনের উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না। হরিচরণ বললেন, মা, ভালো আছো? কমলা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার মুখে কথা আটকে গেছে। ধনু শেখ বলল, আমার কেমন জানি লাগতেছে। শরীর দিয়া গরম ভাপ বাইর হইতেছে। আপনে কিছু মনে নিবেন না। আমি নদীতে একটা ঝাঁপ দিব। ধনু শেখ ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ে গেল। :তিন: এশার নামাজ শেষ করে স্থানীয় মাওলানা বাড়িতে ফিরে রান্না বসিয়েছেন। চাল ডালের খিচুড়ি। এক চামচ ঘি দিয়েছেন, সুন্দর গন্ধ ছেড়েছে। এমন সময় হঠাৎ তাঁর কাছে মনে হলো শুকনা পাতায় খসখস শব্দে কেউ একজন আসছে। মাওলানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শয়তানার উপদ্রব আবার শুরু হয়েছে। মাওলানা আয়াতুল কুরসি পাঠ করে হাততালি দিলেন। তখন মনে হলো উঠানে কে একজন কাশছে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, কে কে? আমি। আমি কে? আমি কে? মাওলানা হারিকেন হাতে বের হয়ে এলেন। চাদর গায়ে হরিচরণ দাঁড়িয়ে আছেন। একহাতে বেতের একটা লাঠি। অন্য হাতে হারিকেন। সঙ্গে আর কেউ নেই। কেমন আছেন মাওলানা সাহেব? জি জনাব, ভালো। আপনি এত রাতে! রাত তো বেশি হয় নাই। আপনি কি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছেন ? মাওলানা বললেন, সামান্য ভয় পেয়েছি। আমার কাছে কোনো কারণে কি এসেছেন? হরিচরণ বললেন, ছোট্ট একটা কারণ আছে। শুনেছি আপনি পুরো কোরান শরীফ মুখস্থ করেছেন, এটা কি সত্য ? মাওলানা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। লজ্জিত গলায় বললেন, হাফেজ টাইটেল এখনো পাই নাই। কোনো বড় মাদ্রাসায় গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে, যেমন ধরেন দেওবন্দ মাদ্রাসা। পরীক্ষা দিতে যান না কেন? খরচপাতি আছে। আমি দরিদ্র মানুষ। অর্থের সংস্থান নাই। হরিচরণ বললেন, আমি খরচ দিলে কি যাবেন ? মাওলানা চুপ করে রইলেন। হরিচরণ বললেন, আপনাদের ধর্মে কি আছে যে অমুসলমানের সাহায্য নেয়া যাবে না? এরকম কিছু নাই। তাহলে আমার সাহায্য নিন। দেওবন্দ থেকে ঘুরে আসুন। জি আচ্ছা। বহুত শুকরিয়া। হরিচরণ সামান্য ইতস্তত করে বললেন, যদি কিছু মনে না করেন একটা অনুরোধ কি করতে পারি? মাওলানা বললেন, অবশ্যই। আপনার মুখস্থবিদ্যার একটা নমুনা কি আমাকে শোনাবেন? মাওলানা বললেন, অবশ্যই। অজু করে আসি। অজু করতে হবে? জি। নাপাক অবস্থায় কোরান মজিদ আবৃত্তি করা ঠিক না। হরিচরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মাওলানা ইদরিস জায়নামাজে বসে কোরান আবৃত্তি করছেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। একসময় কোরান পাঠ শেষ হলো। মাওলানা বললেন, খিচুড়ি পাক করেছি। আপনি কি আমার সঙ্গে খানা খাবেন? অমুসলিমকে খানা খাওয়াতে আপনাদের কোনো সমস্যা নাই? জি-না। সমস্যা কী জন্যে থাকবে? আপনাদের ধর্মের এই জিনিসটা ভালো। আমি আগ্রহের সঙ্গেই খানা খাব। একজনের জন্যে রেঁধেছেন। দুইজনের কি হবে? বেশি করে রেঁধেছি। যেটা বাঁচে সেটা দিয়ে সকালে নাশতা করি। হরিচরণ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন। হাত ধুতে ধুতে বললেন, আরাম করে খেয়েছি। ধন্যবাদ। মাওলানা বললেন, ধন্যবাদ কেন ? আপনার তো আজ রাতে আমার এখানেই খাওয়ার কথা। সব আগে থেকে ঠিক করা। হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, কে ঠিক করেছে? আল্লাহপাক ঠিক করেছেন। মানুষ পশুপাখি সবার রিজিক আল্লাহপাক নিজে ঠিক করে রাখেন। কে কবে কোথায় খানা খাবে সেটা তার জন্মের সময়ই ঠিক করা। :চার: এরপরে বান্ধবপুরের আলোচনার বিষয় মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে হরিচরণ গো-মাংস খেয়েছেন। বিষয়টা নিয়ে হৈচৈ শুরু করেছেন অম্বিকা ভট্টাচার্য। বিভিন্ন দিকে নানা দেনদরবার করছেন। হরিচরণ আগেই জাতিচ্যুত হয়েছেন। গো-মাংস ভক্ষণজনিত গুরুতর অপরাধে নতুন করে কিছু হবার কথা না। তারপরেও অম্বিকা ভট্টাচার্য যথেষ্ট ঘোঁট পাকিয়ে ফেলেছেন। হরিচরণ এবং মাওলানা ইদরিস দুজনেই গুরুতর অপরাধ করেছে। একজন গো-মাংস খেয়েছে, আরেকজন ধর্ম নষ্ট করার জন্যে খাইয়েছে। এই দুজনকেই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। বান্ধবপুরের সীমান্তে জাগ্রত বটগাছের নিচে যে বটকালি মন্দির সেই মন্দিরের মূর্তি মাথা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। অম্বিকা ভট্টাচার্য নিশ্চিত, এই ভয়াবহ অন্যায় কার্যের পেছনেও আছে মাওলানা ইদরিস। কারণ কয়েক দিনই তাকে এই রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে। তাছাড়া মা কালী স্বপ্নে দেখা দিয়ে ইশারায় তাকে বলেছেন, মূর্তি যে ভঙেছে তার মুখভর্তি দাড়ি। বিচার বসিয়ে মাওলানা ইদরিসকে চাকরিচ্যুত করা হল। :পাঁচ: বান্ধবপুরের পশ্চিমে মাধাই খালের দু'পাশে পাঁচমিশালি গাছের ঘন জঙ্গল। বাঁশঝাড়, ডেউয়া, বেতঝোপ, ভূতের নিবাস ঝাঁকড়া শ্যাওড়া গাছ। জায়গায় জায়গায় বুনো কাঁঠাল গাছ যে গাছ কখনো ফল দেয় না। এমনই এক কাঁঠাল গাছের নিচে আজ ভোর রাতে একটা বকনা গরু জবাই হয়েছে। জবাই করেছেন মাওলানা ইদরিস। ধনু শেখের মানতের গরু। ধনু শেখকে গত বছর কলেরায় ধরেছিল। জীবন যায় যায় অবস্থায় তিনি মানত করেন— যদি এই দফায় প্রাণে বাঁচেন তাহলে গরু শিন্নি দেবেন। গরু শিন্নি কঠিন বিষয় জঙ্গলের ভেতর করতে হয়েছে। ধনু শেখ বাড়ির দু'জন কামলা এবং তার ছোটভাইকে নিয়ে এসেছেন। গরু জবাইয়ের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে। চামড়া হাড়গোড় গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কেউ যেন বুঝতে না পারে। শিন্নির মাংস সবাইকে ভাগ করে দেয়া নিয়ম। ধনু শেখ নিজে এই কাজটি করছেন। মুসলমান ঘর হিসাব করে করে মাংস ভাগ করছেন। পদ্ম পাতায় মাংস পুঁটলি করা হচ্ছে। দিনের মধ্যেই বাড়ি বাড়ি মাংস পৌঁছে যাবে। মাওলানা ইদরিস একটু দূরে বসেছেন। তাঁকে সামান্য চিন্তিত মনে হচ্ছে। গোপনে গরু জবেহ করার খবর চাপা থাকবে তার এরকম মনে হচ্ছে না। সামনে মহাবিপদ। ধনু শেখ বললেন, মাওলানা, আপনারে দুই ভাগ দেই? মাওলানা বললেন, প্রয়োজন নাই। এক ভাগ দিলেই চলবে। আমি একজন মোটে মানুষ। ঘরে তেল আছে তো? গরুর মাংসের সোয়াদ তেলে। অর্ধেক মাংস অর্ধেক তেল, যতটুকু মাংস ততটুক পেঁয়াজ। পেঁয়াজের অর্ধেক আদা। অল্প আঁচে দুপুরে বসাবেন সন্ধ্যারাতে নামাবেন- অমৃত। জঙ্গল থেকে তারা বের হলো দুপুরের আগে আগে। ধনু শেখ পদ্ম পাতায় মোড়া মাংসের ঝাকা এবং দলবল নিয়ে মাধাই খালে এসে নৌকায় উঠল। নৌকা সরাসরি ধনু শেখের বাড়ির পেছনে থামল। ধনু শেখ নিজ বাড়িতে ছেলের আকিকা উপলক্ষে দু'টা খাসি জবেহের ব্যবস্থা করেছেন। খাসি জবেহতে কোনো বাধা নেই। এই কাজ প্রকাশ্যে করা যায়। ধনু শেখ খাসির মাংসের সঙ্গে সব মুসলমান বাড়িতে এক পোঁটলা গরুর মাংসও দিয়ে দিলেন। হতদরিদ্ররা যেন মাংস ঠিকমতো রাঁধতে পারে তার জন্যে তেলমসলা কেনা বাবদ একটা করে আধুলি পেল। বাড়িতে বাড়িতে মাংস রান্না হবে। গন্ধ ছড়াবে। কারোর কিছু বলার নেই। খাসির মাংস রান্না হচ্ছে। এক পোঁটলা মাংস গেল অম্বিকা ভট্টাচার্যের কাছে। ধনু শেখ নিজেই নিয়ে গেলেন। অতি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ঠাকুর। আমার ছেলের আকিকার খাসির মাংস। আত্মীয় বান্ধবদের বাড়িতে এই মাংস বিলি করার বিধান আছে। এই মাংস আপনি কি গ্রহণ করবেন? অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, খাসির মাংসে কোনো দোষ নাই। তবে মুসলমানের বাড়ির মাংস বিধায় শোধন করে নিতে হবে। শোধন করার খরচা যদি দাও মাংস নিতে পারি। খরচা কত ? এক টাকার কমে হবে না। কর্পূর লাগবে। একশ' বছরের পুরনো ঘিতে কর্পূর দিতে হবে। সেই ঘি পুড়িয়ে তার ধোঁয়া মাংসের গায়ে লাগাতে হবে। বিরাট ঝামেলা। ধনু শেখ এক টাকার জায়গায় দু'টাকা দিলেন। মাংস শোধন বাবদ এক টাকা। তেল এবং মশলাপাতি কেনা বাবদ এক টাকা। ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দ করে সেই রাতে গরুর মাংস খেলেন। পরদিন চাদরে আতর মাখিয়ে পাম্পশু পায়ে ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের বাড়িতে গেলেন ধনু শেখ। বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, পুত্রের আকিকার মাংস ঠাকুর খেয়েছেন কি-না। অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, সবাইকে নিয়ে খেয়েছি। তৃপ্তি করে খেয়েছি। ধনু শেখ বললেন, শুনে খুশি হলাম। তবে ঠাকুর একটা বিষয়। মাংসটা গরুর। ভুলক্রমে খাসির মাংস ভেবে আপনাকে গরুর মাংস দিয়েছি। গোপনে একটা গরু জবেহ করেছিলাম। সেই গরুর মাংস। হতভম্ব অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, কী বললা? ধনু শেখ বললেন, যা বলেছি সত্য বলেছি। তবে আপনার চিন্তার কিছু নাই। কেউ জানবে না। অম্বিকা ভট্টাচার্য বিড়বিড় করে বললেন, কেউ জানুক বা না-জানুক, জাত তো চলে গেছে। ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, জাত চলে গেলেও চুপ করে থাকেন। আপনার কন্যা আছে। তার বিবাহ দিতে হবে না? ঠাকুর, যাই। অম্বিকা ভট্টাচার্য কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, এইটা তুমি কী করলা? ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, আপনাদের এমন কিছু কি আছে যা খেলে মুসলমানের জাত যাবে ? থাকলে দেন খাই। সমানে সমান হবে। ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের সপরিবারে গো-মাংস ভক্ষণ কাহিনী তৃতীয় দিনের দিন প্রকাশিত হয়ে পড়ল। বিধান দেবার জন্যে শ্যামগঞ্জ থেকে ন্যায়রত্ন রামনিধি চলে এলেন। তিনি বললেন, গরু যদি অল্পবয়স্ক হয় তাহলে জাত যাবে না। প্রায়শ্চিত্ত করলেই হবে। কারণ পার্বতীর পিতা, শিবের শ্বশুর মহারাজা দক্ষ যে যজ্ঞ করেছিলেন সেখানে গোবৎস বধ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণরা গোবৎসের মাংস খেয়েছেন। জানা গেল ঠাকুর অধিকা ভট্টাচার্য যে মাংস খেয়েছেন তা বয়স্ক গরুর মাংস। ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, এরও বিধান আছে। যে পরিমাণ গো-মাংস প্রত্যেকে খেয়েছে সেই পরিমাণ কাঁচা গোবর এক সপ্তাহ খাবে। তাতে শরীর শোধন হবে। শরীর শোধিত হবার পর গঙ্গায় একটা ডুব দিলে গো-মাংস ভক্ষণজনিত বিষ শরীর থেকে চলে যাবে। ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য শরীর শোধনের প্রাথমিক পরীক্ষায় ফেল করলেন। এক চামচ গোবর মুখে দিয়ে বমি করতে করতে মৃতপ্রায় হলেন। সপরিবারে মুসলমান হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এক শুক্রবার জুমা নামাজের পর তিনি মাওলানা ইদরিসের কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিলেন। সবাই মুখে তিনবার বললেন লা ইলাহা ইল্লাললাহ। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই। মুহাম্মদ তাঁর রসুল। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। মাওলানা ইদরিস প্রত্যকের ডান কানে তিনবার করে সূরা ইয়াসিন পাঠ করে ফুঁ দিয়ে দিলেন। ফুঁর পরপরই ডান হাতে কান বন্ধ করতে হলো। সূরা ইয়াসিন দীর্ঘ সময় কানের ভেতর থাকে। হাজাম ধারালো বাঁশের কঞ্চি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পর্ব শেষ হওয়া মাত্র সে দলের পুরুষদের খতনা শুরু করল। তাদের চোখের জল এবং চাপা গোঙানির ভেতর দিয়ে ইসলাম ধর্মে দাখেলের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলো। অম্বিকা ভট্টাচার্যের নাম হলো— মোহম্মদ সিরাজুল ইসলাম। সবাই ডাকা শুরু করল সিরাজ ঠাকুর। ঠাকুর থেকে মুসলমান হয়েছেন এই জন্যেই নামের শেষে ঠাকুর। ইনিই হুমায়ুন আহমেদের সেই মাতুল বংশীয় পূর্ব পুরুষ। [মীর সালমান সামিলের পোষ্ট থেকে সামান্য পরিবর্তন করে]