১৯৭১ সালের মুজিব বাহিনী সম্পর্কিত কিছু তথ্য
১৯৭১ সালের মুজিব বাহিনী সম্পর্কিত কিছু তথ্য শেখ হাসিনার মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আবদুল করিম খন্দকার বা এ কে খন্দকার এর লিখিত '১৯৭১: ভেতরে বাইরে' বইটি থেকে কিছু অংশ তুলে দিলাম। মুজিব বাহিনী:- অস্থায়ী সরকার গঠনের আগে, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ বাহিনী বা মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। অস্থায়ী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ বাহিনীর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো সরকার দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিবাহিনী সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের সব কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছু বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে তৎপর ছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল স্থানীয় পর্যায়ের এবং তাদের অভিযানের এলাকা ছিল সীমিত। তারা কিছুটা স্বাধীনভাবে তাদের অভিযান পরিচালনা করলেও স্থানীয় সেক্টর কমান্ডার সাথে সব সময় সমন্বয়তা করে চলত। তাদের সাথে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে তারা সরকারের বিপক্ষেও ছিল না। মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরও দুটি বাহিনী ছিল, যারা তুলনামূলকভাবে জনবল ও সামরিক দিক দিয়ে বড় ছিল। এ দুটির মধ্যে প্রথমটি ছিল টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, যারা কাদের সিদ্দিকী সাহেবের পৃথকভাবে পরিচালিত হলেও সরকার ও মুক্তিবাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক রাখত। দ্বিতীয়টি ছিল মুজিব বাহিনী, যারা সম্পূর্ণভাবে অস্থায়ী সরকার ও বাংলাদেশ বাহিনী থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রায়শই তারা অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিবাহিনীকে অবজ্ঞা করত এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করত। মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। শুরু থেকেই মুজিব বাহিনী ও এর কর্মকাণ্ড নিয়ে বহু বিতর্ক ছিল। অস্থায়ী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দ্বন্দ্ব হয়ত মুজিব বাহিনী গঠনে অনুপ্রাণিত করেছিল। রাজনৈতিকভাবে তাজউদ্দীন সাহেব অস্থায়ী সরকারের সব মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন পাননি। অস্থায়ী সরকার গঠনকালে এক প্রকার চেষ্টা চলছিল তাজউদ্দীন সাহেবকে যেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া না হয়। কারণ হিসেবে বলা হতো যে তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুগত নন। তাজউদ্দীনের বিরোধীরা এমন কাউকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিল, যাকে সামনে রেখে তারাই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। তাজউদ্দীনের ব্যক্তিত্ব ও সততার কারণে বিরোধীরা সুবিধা করতে পারছিল না। এটা খুবই দুঃখজনক যে যখন আমরা স্বাধীন নই এবং অন্য দেশের ভূখন্ডে বসে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছি, যখন আমরা জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কী, যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি ঐক্যের প্রয়োজন তখনই কিনা আমরা নানা দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী ও এর সেক্টরগুলো অস্থায়ী সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত হলেও স্থানীয় ও অন্য বাহিনীগুলো তাদের নিজস্ব নিয়মে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাত। এটা হতে পেরেছিল মূলত অস্থায়ী সরকারের প্রথম দিকের একটি সিদ্ধান্ত থেকে। সিদ্ধান্তটি ছিল, আওয়ামী লীগ বা তাদের মনোনীত ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে মুক্তিবাহিনীতে নেওয়া হবে না। অপর দিকে মুক্তিবাহিনীর ওপর ভারতীয়দের প্রভাবজনিত অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও অন্যদের আলাদা বাহিনী গঠনে উৎসাহিত করে। কেননা ওসমানী চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সব বাহিনী মুক্তিবাহিনীর অধীনে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তা হয়নি। ছোট ছোট বাহিনীগুলো তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর অধিনায়কদের সাথে সমঝতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করত। কিন্তু মুজিব বাহিনীর বিষয়টি ছিল একেবারেই ভিন্ন। যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্ব অস্থায়ী সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন প্রভাব ছিল। ... মুজিব বাহিনীর গঠনপ্রণালী আলাদা ছিল। এ বাহিনীর সমন্বয়কারী ও প্রশিক্ষক ছিলেন ‘র’-এর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান। তিনি এস এস উবান নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করা হয়।