Back to Home

মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম ট্যাবলেট রহস্য

মেসোপটেমিয়া গ্রীক শব্দ, যেটা দিয়ে আধুনিক ইরাককে বোঝানো হয় (ছবি ১)। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা (সুমেরিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান) নরম মাটির ওপর লেখালেখি করত, আঁকত। এই লেখার পদ্ধতিকে বলা হয় কিউনিফর্ম (Cuneiform)। এই পদ্ধতি মূলত সুমেরিয়ানদের আবিষ্কার। এই নরম মাটি, যেটা পরে শুকিয়ে শক্ত হয়, যেটা ট্যাব বা ট্যাবলেটের মত দেখতে সেটাকে বলা হয় ক্লেয় বা মাটির ট্যাবলেট। যেগুলো আসলে শক্ত কিন্তু ভঙ্গুর ছিল, যে কারনে এসব মাটির ট্যাবলেট এখন একদম সম্পূর্ন অরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যায় না, টুকরা টুকরা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। এই কিউনিফর্মে লিখিত ভাষা এখনও পুরোপুরি বোঝা না গেলেও সিংহভাগই ডিসাইফার করা গেছে। ব্যাবিলনিয়ানদের ক্লেয় ট্যাবলেটে তৈরী করা একটি ম্যাপ, যেটা ১৮৮০ সালে ইরাকের বাগদাদে পাওয়া গেছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরাতন ম্যাপ। এটাকে বলা হয় Imago Mundi। সেই ক্লেয় ট্যাবলেটের সামনে (ছবি ১-১) ও পেছনের দুটো অংশের সামনের অংশের নিচের দিকে (ছবি ১-২) সেই ম্যাপ আঁকা, আর ওপরের অংশে কিছু কিউনিফর্মে লেখা এবং পেছনে দিকে আরও কিছু লেখা পাওয়া গেছে (ছবি ২)। সামনের ওপরের অংশের লেখায় রয়েছে পৃথিবীর শুরুর দিকের ইতিহাস, কিভাবে প্রাণীদেরকে জলে স্হলে ডিস্ট্রিবিউট করা হল। নিচের অংশের ম্যাপটি এভাবে আঁকা - ডাবল সার্কেল (ছবি ১-৩) আর সার্কেলের বাইরের চারিদিকে ৮টা ত্রিভূজ (ছবি ৩ ও ৪)। ডাবল সার্কেলের দুই সার্কেলের মাঝেে তিনটি জায়গায় একই লেখা, ‘তিক্ত নদী’ (ছবি ৫ ও ৬-১)। এটার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে ‘জানা পৃথিবী’টাকে বা তাদের ব্যাবিলনকে এই তিক্ত নদী ঘিরে রয়েছে এবং সার্কেলের ভেতরের অংশ দিয়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াকে বোঝানে হয়েছে। সার্কেলের ভেতরে উত্তর থেকে দক্ষিণ জুড়ে একটি নদীকে দেখানো হয়েছে, যেটা ইউফ্রেটিস নদী (ছবি ৬-২)। এই নদীর একটা অংশে আড়াআড়িভাবে ব্যাবিলন শহর দেখা যায় (ছবি ৬-৩)। সার্কেলের ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো ছোট রিং (ছবি ৭), যেগুলোতে বিভিন্ন শহর বা জাতির নাম লেখা। একদম ওপর থেকে ডানে নামগুলো পড়লে এমন - (ছবি ৮ ও ৯) পাহাড়, কোন এক শহর, উরারতু, এ্যাসিরিয়া, দার, একটা জলাশয়, সুসা, বিত ইয়াকিন, কোন এক শহর, হাব্বান। ডাবল সার্কেলের বাইরের চারিদিকে যেই ত্রিভূজগুলো রয়েছে, সেগুলো ব্যাবিলনিয়ানদের কাছে রহস্যময়, যাদুর দ্বীপ, পাহাড় ইত্যাদি বিভিন্ন স্থান। যদিও ম্যাপটির পুরো অংশের অস্তিত্ব নেই, তবে বোঝা যায় এখানে এমন ৮টি ত্রিভূজ আঁকা ছিল (ছবি ৪)। যেই ৮টি ত্রিভূজের প্রতিটির ব্যাপারে ছোট্টকরে বর্ণনা রয়েছে ট্যাবলেটের পেছনে। এই ত্রিভূজ দিয়ে যেসব স্থানকে বোঝানো হয়েছে সে স্থানের একটা স্থানে কখনই সূর্য দেখা যায় না, আরেকটার গাছে ফলের বদলে হীরা পাওয়া যায়, অন্য এক স্থানে বড় পাখি আছে যেগুলো উড়তে পারে না। যদিও তাদের কেওই এসব জায়গায় যায় নি তবুও তারা এসবে ব্যাপারে বিভিন্ন তত্ব উপাত্বের ওপর ভিত্তি করে এসব ধারণা করেছে। ম্যাপটি আবিষ্কারের শুরুতে দীর্ঘদিন সঠিকভাবে ধারনা করা যায় নি কোন ত্রিভূজের জন্য কোন বর্ণনা করা হয়েছে, কারন ম্যাপটির একটি অংশ ভাঙা ছিল। ব্যাবিলনের বা আধুনিক ইরাকের আর্কিওলজিক্যাল বিভিন্ন স্থানগুলোয় পাওয়া মাটির ছোট ভাঙা বিভিন্ন টুকরার সাথে ঐ হারানো অংশের মিল খোঁজার অনেক চেষ্টা করা হলেও ব্যার্থ হতে হয়েছে দীর্ঘদিন। এরপর ১৯৯০সালের পর সেই ভাঙা হারানো ত্রিভূজটির অংশ খুঁজে পাওয়া যায়। সেই ত্রিভূজে কিউনিফর্মে লেখা ছিল “গ্রেট ওয়াল” (ছবি ১০)। এই অংশের ব্যাপারে ট্যাবলেটটির পেছনের বর্ণনার লেখাটা এমন - “পঞ্চম ত্রিভুজদ্বারা নির্দেশিত জায়গায় যেতে হলে তোমাকে ৭লিগ (২৪মাইল) যেতে হবে, যেটার মানে ওই তিক্ত নদী পার হতে হবে। ৭লিগ যাওয়ার পর তুমি একটা পাহাড়ের নিচে পৌঁছাবে। গ্রেট ওয়াল, এটার হাইট ৮৪০কিউবিট (৩৭৮মিটার), সেখানের গাছ ১২০কিউবিট (৫৪মিটার)। সেখানে দিনের বেলায় তুমি তোমার সামনে কি সেটাও দেখতে পাবে না, রাতে শুয়ে…(এরপরের অংশ ভাঙা) এরপর তোমাকে আরও ৭লিগ (২৪মাইল) যেতে হবে বালির (বা মরুভূমির) ওপর দিয়ে এবং তোমাকে অবশ্যই…..(আবারও ভাঙা অংশ)”। ম্যাপের ওই হারানো ত্রিভূজের অংশ উদ্ধার হওয়ায় এখন বাকি বর্ণনার কোনটা কোন ত্রিভূজের জন্য সেটা জানা সম্ভব হয়েছে, কারন এখন তিনটি ত্রিভূজ পরপর সাজানো সম্ভব হয়েছে। আরেকটি ব্যাপার হল এই বর্ণনার ধারাবাহিকতা এক ত্রিভূজ থেকে আরেক ত্রিভূজে ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে করা হয়েছে। এই ম্যাপের ৪ নাম্বার ত্রিভূজটি সম্ভবত সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। ওই ৪ নাম্বার ত্রিভুজে বাকিগুলোর মতই রুপকথার মতকরে বলা হয়েছে - “তোমাকে ৭লিগ (২৪মাইল) পার হতে হবে সমুদ্র পার হতে হলে…” এরপরের অংশ নেই, এরপর লেখা - “…এরপর তুমি এমন জিনিস দেখতে পাবে যেটা পার্সিক্তু নৌযানের মত মোটা ।” এই পার্সিক্তু নৌযানের ব্যাপারে ব্যাবিলনিয়ান বিভিন্ন ট্যাবলেটগুলোতে অহরহ পাওয়া যায়, কিন্তু এটা আসলে কি সেটা জানা যায় নি এখনও। এরপর যেই বর্ণনা রয়েছে সেটা নূহ (আ:) এর সময়ের সেই ভয়ংকর বন্যার ঘটনার সাথে মিলে যায়, পুরো পৃথিবীগ্রাসী যেই বন্যা থেকে নূহ (আ:) তার জাতিকে রক্ষার জন্য বিরাট বড় নৌকা তৈরী করেন আল্লাহর নির্দেশে। এই নৌযান ব্যাবিলনিয়ানদের তথ্য অনুযায়ী ১৮০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে তৈরী। যেটা আমাদের ধারনা করা হিসাবের সাথে মেলে না। আবার তাদের ভার্সনে একটু অন্য ভাবে ঘটনাকে বলা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ নূহ (আ:) কে এটা সেটা করতে আদেশ করছেন, নূহ (আ:) বলছেন হ্যাঁ আমি এটা করেছি, ওটা করেছি, আমি কাজটা শেষ করেছি ইত্যাদি। এবং ঘটনাটি নূহ আ: নিজে বলছেন এমনভাবে লেখা। ৪নাম্বার ত্রিভূজের বর্ণনায় আরও লেখা - “তুমি যদি বিরতি দিয়ে, বিশ্রাম নিয়ে পাহাড়ের ওপর ওঠ তবে তুমি দেখবে কালো রঙের পাঁজড়ের হাড়ের মত দেখতে বাঁকা কাঠের নৌকা, যেটা পার্সিক্তু যানের মত মোটা, যেটা নূহের (আ:) নৌকার ধ্বংসাবশেষ, যেটা সেই পাহাড়ের ওপর পরে রয়েছে। এরপর তুমি পাহাড় থেকে নেমে, সমুদ্র পার হয়ে মাতৃভূমির (ব্যাবিলন) দিকে আসলে প্রথমেই যেখানে আসবে সেটা হল উরারতু (ছবি ১১)।” চমক লাগানো একটা ব্যাপার হল বাইবেলে নূহ (আ:) এর নৌকা যেই পাহাড়ের ওপর থামে বলে বলা হয়েছে সেটা হল আরারাত, যেটা হিব্রু শব্দ। আরারাতের এ্যাসিরিয়ান অনুবাদ বা কাছাকাছি হল উরারতু। ব্যাবিলনিয়ানদের বর্ণনায় এমন ভাবে লিখিত যে নূহ (আ:) এর নৌকাটা দেখতে পারা একটা স্বাভাবিক ঘটনা, মানে ওরা জানত নৌকাটার অস্তিত্ব ও অবস্থানের ব্যাপারে। এখন একটা বিষয় মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে এই ট্যাবলেটের লেখক আসলে কে? ট্যাবলেটের একদম নিচে যদিও ভেঙে যাওয়ায় পুরোপুরি বোঝা যায় না তবুও যতটুকুই আছে তা থেকে লেখকের বাবার নাম পড়া যায়। ব্যাবিলনিয়ানরাও লেখার শেষে নিজের নাম লিখত। যেই লেখাকে বাবার নাম হিসেবে ধারণা করা হয়েছেে সেটা হল “ইস্সুরু”, যার মানে হল পাখি। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল ব্যাবিলনিয়ানদের নাম কখনই পাখি বা এই ধরনের কিছু হয় না। ব্যাবিলন থেকে পাওয়া কোন লেখা থেকেই এমন কোনই তথ্য পাওয়া যায় না যেখানে কারও নাম পাখি হতে পারে। তাদের নাম অনেকটা এমন হয় - অমুক যার সৌন্দর্য অতুলনীয়, তমুক যে তার অমুক প্রভুর দাস, অমুক ইত্যাদি। কখনই পাখি বা এই জাতীয় নাম হয়না। সন্দেহের বিষয়। এই ব্যাপারটাও অবশেষে উদঘাটন করা গেছে চমৎকারভাবে। ম্যাপটা যেকেও হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে একটু দুরে থেকে খেয়াল করলেই আবিষ্কার করতে পারবেযে ওই পাখি আসলে কারও নাম না। সেটা হল পাখির চোখে দেখা ব্যাবিলন, পাখি ব্যাবিলনকে ঠিক যেভাবে দেখে এমন একটা চিত্র। যেটা আমরা ড্রোন দিয়ে ছবি তুলে বা ভিডিও করে লিখি ‘বার্ডস আই ভিউ’। ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার না? ব্যাবিলনিয়ানরাও আমাদের মতই বার্ডস আই ভিউ এর ধারণা পোষণ করত। ছোট্ট একটা মাটির খন্ড, সেটা থেকে ব্যাবিলনিয়ানদের ধ্যান, ধারনা, জ্ঞান কত কিছু জানা গেল।