Back to Home

ফ্রম নাবিলা ইদ্রিস: গুমঘর

ফ্রম নাবিলা ইদ্রিস:- গুমঘরের এক প্রহরীর সাথে আলাপের সময় তিনি আমাকে একটা কথোপকথন ন্যারেট করেছিলেন, যা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে। ওনার এক কলিগকে উনি একবার বলেন, "আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় এখানে আপনি যা করছেন তা ভাল কাজ?" তখন সেই কলিগ উত্তর দিয়েছিল, "হ্যাঁ, আমি তো বন্দীদের দেখে রাখছি, খাবারদাবার দিচ্ছি, বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছি। আমি তাদের পরিচর্যা করছি। আমার অবর্তমানে তো তারা কস্ট পেত।" যেই ভদ্রলোক আমাকে বর্ণনা করছিলেন, তিনি কথাটা মেনে নিতে পারেননি। আমাকে বলেছিলেন, "আমার এরকম মনে হয় নাই। আমাদের কমান্ডে কিছু ছিল না বটে, কিন্তু আমার মনে হত আমরাও যুলুমের অংশীদার।" সম্পূর্ণ অজান্তেই, খুব ছোট এই অভিব্যক্তির মাধ্যমে হ্যানা আরেন্টের 'আইখম্যান ইন জেরুজালেম' বইয়ের সেন্ট্রাল ডিলেমা ফুটিয়ে তুলেছিলেন এই সাধারণ প্রহরী। (বাই দ্য ওয়ে, এই কারণেই প্রশ্ন করা আর উত্তর শোনা আমার ফেভারিট কাজ, যদিও পৃথিবীতে খুব কম মানুষই এই অতি কৌতূহল সহজ ভাবে নেয়। যারা আমার নিরন্তর প্রশ্ন সহ্য করেন, তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা!) আরেন্ট নাৎসি অফিসার এডলফ আইখম্যানের বৈপরীত্য এক্সপ্লেইন করার চেষ্টা করছিল - এই লোক যে এত মানুষের মৃত্যুর লজিস্টিকাল আয়োজন করেছে, সে রিয়েল লাইফে কীভাবে একজন বোরিং আমলা মাত্র, কোন অতি ইভিল মনস্টার না কেন? আইখম্যানও নিজেকে ডিফেন্ড করেছিল এই বলে যে, "আমি তো কখনও কাউকে মারিনি, কারও মৃত্যু অর্ডারও করিনি। যারা মারা গিয়েছে তাদের চিনি না, কোন ব্যক্তিগত বিরোধও নেই। আমি শুধু আমার ডিউটি পালন করেছি।" আরেন্ট বলেছেন আইখম্যানের ইভিল জন্ম নিয়েছে "চিন্তার অনুপস্থিতি" থেকে; অন্ধ আনুগত্যের বশে তার কাজের মানবিক পরিণতি নিয়ে অচেতনতা থেকে। এইটুক তো একাডেমিক জগতে আমরা প্রায় সবাইই অল্প বিস্তর জানি। কিন্তু এখানে আমি আরেকটা ইস্যু যোগ করতে চাই। "বোরিং আমলা" আইখম্যানের চারপাশের মানুষ তাকে কীভাবে দেখত? গত এক বছরের অভিজ্ঞতা আমাকে বলে আইখম্যানকে সুপার ইভিল কিছু না, তারা ঠিক "বোরিং আমলা" হিসেবেই দেখত। কারণ কথাচ্ছলে অনেক নিরেট ভাল মানুষদের কাছ থেকেও শুনি, "আপনারা চমৎকার কাজ করছেন। কিন্তু অমুক ভাইকে আমি চিনি। আসলে উনি খারাপ মানুষ না। বদ নসিব যে আপনাদের ইনকোয়ারিতে জড়িয়ে পড়েছেন।" আই বিলিভ দেম। ডে টু ডে লাইফে আমার মনে হয় অনেক অভিযুক্তই ঠিক ডিপজলের "আহো ভাতিজা" মার্কা ইভিল ছিল না, "বোরিং আমলা" ইভিলই ছিল। তাই সিনেমার আইডিয়াল ভিলেনকে না পেয়ে, চারপাশের মানুষ বিস্তর ধাক্কা খাচ্ছে। আমিও প্রথমে খেয়েছি। অনেক অভিযুক্তরা সিম্পলি চার্মিং, ইন এনাদার লাইফ হয়ত দিব্যি গল্প করা যেত। প্রথম যেদিন জেলে গিয়ে গুম-খুনের জন্য মৃতুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের একের পর এক নরমাল দিনেও রোজাদার পাচ্ছিলাম, ব্যাপক কনফিউজড ছিলাম। কী হচ্ছে এখানে? আমি আসছি বলেই কি রোজার ভান করছে? উহু - পরে বুঝেছি ওনারা আসলেই বছরের পর বছর স্বেচ্ছায় নফল রোজা রাখছেন। নিজের মুসলিমনেস নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হলাম বটে। তাদের নফল ইবাদত আমি কীভাবে রিড করব? আমারই যদি রিড করতে প্রব্লেম হয়, যার কাছে এভিডেন্স স্প্রেড ক্লিয়ার, তাহলে তাদের চেনা পরিচিতজনদের রিড করা হয়ত আরও কঠিন হতে পারে। এর মানে কিন্তু তার ক্রাইমের গভীরতা কমে যাওয়া না - আইখম্যান ইজ স্টিল আইখম্যান - কিন্তু এতে চারপাশের কনফিউশানের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একবার একটা জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত ছিলাম যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী (উনি স্বেচ্ছায় এসেছিলেন, কেউ ডাকিনি) ইন্সিস্ট করেছিলেন তাঁর স্বামী একেবারেই নির্দোষ। টিম লিডার ঘুরে ভদ্রলোককে বলেছিলেন, "আমাদেরকে যা বলেছেন, ভাবীকে জানান।" ছয় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর ভদ্রলোক আমাদের যা বলেছিলেন, তা বলার সময় আমি মনোযোগ দিয়ে ভাবীকে দেখছিলাম। শি রিয়েলি হ্যাড নো ক্লু। আমি বিশ্বাস করি এই ভদ্রলোক সত্যিই একজন ভাল স্বামী, অসাধারণ বাবা, এবং দরদী প্রতিবেশী। উনি আইডিয়াল ইভিল না। আইডিয়াল ইভিল নাই, বা খুব কম আছে পৃথিবীতে (পলাতক মহিলাটা এক্সসেপশান)। কিন্তু এতে ভদ্রলোকের ক্রাইমের বোঝা লাঘব হয় না। আমার ভয় বাংলাদেশে অচিরেই আমরা আইডিয়াল ইভিল-আইডিয়াল ভিক্টিমের একটা কন্সেপচুয়াল চক্করে পড়তে যাচ্ছি। আইডিয়াল ইভিলের মূলা ঝুলিয়ে আমাদের ডিস্ট্র্যাক্ট করা হবে। আমাদের এই ট্র্যাপ এভয়েড করা উচিত। আমরা গডের সিটে নাই। আমরা মানুষের এটারনাল লাইফের আউটকাম নির্ধারণ করছিনা। বাংলাদেশে একটা স্পেসিফিক সময়ের একটা স্পেসিফিক অপরাধের বিচার করার আপ্রাণ চেষ্টা হচ্ছে। এখানে আইডিয়াল ইভিল প্রয়োজন নেই, খোঁজাও উচিত না। খুঁজলে, ভিক্টিম আর ভিলেন, দুজনের প্রতিই অনর্থক অবিচার হবে। (আইডিয়াল ভিক্টিম নিয়ে সামনের দিন বলব, হ্যাঁ?)